Home | ইসলাম | যেকারনে এক হাজার উট কুরবানি করেছিলেন মুহাম্মাদ (সা:) এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব

যেকারনে এক হাজার উট কুরবানি করেছিলেন মুহাম্মাদ (সা:) এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব

একদিন আব্দুল মুত্তালিব কাবা চত্বরে শুয়ে থাকা অবস্থায় স্বপ্নে জমজম কূপের অবস্থানের সন্ধান পান। তিনি ছেলে হারিসকে নিয়ে সেখানে খনন করতে গেলেন। কূপের মুখে পাথর দেখে তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। কুরাইশরা তখন জড়ো হলো। তারা বলতে শুরু করল, এ তো আমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাইলের কুয়া। আমাদেরও এতে অধিকার আছে খনন করবার। কিন্তু আব্দুল মুত্তালিব বললেন যে, তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, তাই দায়িত্বটা তার একারই।

বাকি নেতারা বলল, তারা সকলে আব্দুল মুত্তালিবের উপর নাখোশ হবেন।

তাদের চিন্তাটা এরকম ছিল যে, যদি আব্দুল মুত্তালিব একা এই পবিত্র কুয়ার আবিষ্কারক হন তবে বনু হাশিম অনেক সম্মান পেয়ে যাবে, এটা অন্য গোত্রদের জন্য অপমানজনক।

তখন আব্দুল মুত্তালিব বললেন, “ঠিক আছে। আমরা তবে একজন সালিশকারীর সাহায্য নেই।”

নেতারা জানালো, সিরিয়ার কাছে সাদ হুযাইম গোত্রের একজন জ্বিন উপাসিকা আছেন, উনি নাকি জ্বিনদের সাহায্যে ভবিষ্যৎ বলতে পারেন। আরবে তখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এরকম জ্বিন উপাসিকা। কোনো এক অদ্ভুত কারণে জ্বিন-‘উপাসক’ কম ছিল। বেশিরভাগই ছিল মহিলা।

আব্দুল মুত্তালিব তখন নিজের গোত্রের কয়েকজন আর বাকি প্রত্যেক গোত্র থেকে কিছু মানুষ নিয়ে রওনা দিলেন সেই মহিলার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তারা যখন হেজাজ আর সিরিয়ার মাঝের এক জনশূন্য এলাকায় পৌঁছালেন তখন তাদের পানি শেষ হয়ে গেল। ‘তাদের’ বলতে আব্দুল মুত্তালিবের গোত্রের মানুষের। তারা অন্য গোত্রের কাছে পানি চাইলে তারা দিতে অস্বীকার করল। বলল, এটা আব্দুল মুত্তালিবেরই দোষ যে, তারা এই মরুর ভুকে ধুঁকে মরছে।

এক ফোঁটা পানি না পেয়ে আব্দুল মুত্তালিব মৃত্যুকেই বেছে নিলেন। তিনি সবাইকে বললেন নিজেদের কবর খুঁড়তে। এতে করে শেষ বেঁচে থাকা লোকটিকে কষ্ট করে বাকিদের কবর দিতে হবে না। নিজেদের কবরে নিজেরাই মরতে পারবে। কিন্তু কবরে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই আব্দুল মুত্তালিবের ধারণা পালটে গেল।

তিনি হঠাৎ উঠে সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা সকলে আবার উট নিয়ে রওনা দেবেন। আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই কিছু ব্যবস্থা করবেন। দূর থেকে বাকি গোত্র-সদস্যরা দেখতে থাকলেন তিনি কী করেন।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার, আব্দুল মুত্তালিবের উট হঠাৎ এক জায়গায় পা দিতেই খুড়ের আঘাতে সেখান থেকে পানি বেরুতে লাগলো! সকলে ‘আল্লাহ্‌ মহান’ চিৎকার করে উঠলেন। তখন বাকি গোত্রের সকলে মেনে নিলেন যে আব্দুল মুত্তালিবই একমাত্র জমজম কূপের আবিস্কারক হবার যোগ্য। সেই তখন থেকেই আর কখনো তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেনি কেউ। তিনি উমাইয়া না হয়েও ছিলেন মক্কার নেতা, হাশিম গোত্রের সদস্য।

তো আমরা কথা বলছিলাম তাঁর সন্তানদের নিয়ে, মূলত ছেলেদের নিয়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে কর্মঠ, সুদর্শন আর সবার প্রিয় ছিল তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ। অনেক মেয়েই তাই বিয়ে করতে চাইত আব্দুল্লাহকে। কিন্তু তিনি বাবার অমতে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

আব্দুল মুত্তালিবের অনেকদিন ধরে কেবল একটাই ছেলে ছিল, হারেস। ইবনে হিশামের বই থেকে আমরা জানতে পারি যে, সেই কূপের ঘটনার পর তিনি মানত করেন যে, তাঁর যদি ১০ জন পুত্র সন্তান হয়, আর তাঁরা সকলে প্রাপ্তবয়স্ক হন তবে তাদের একজনকে তিনি কুরবানি দেবেন। উল্লেখ্য, তাঁর প্রিয়তম পুত্র ছিলেন আব্দুল্লাহ।

একদিন সবাইকে কাবার কাছে আব্দুল মুত্তালিব ডেকে পাঠালেন। তাঁর সন্তানেরা যখন বাবার ওয়াদার কথা শুনল তখন, তাঁরা রাজি হয়ে গেল তাদের মাঝে একজন কুরবান হবার জন্য। তখন আব্দুল মুত্তালিব বললেন, “প্রত্যেকে একটি করে কাঠের তীর নাও। ওটার উপর নিজের নাম লিখে আমার কাছে আসো।”

সেটা করবার পর তাদের নিয়ে আব্দুল মুত্তালিব গেলেন হুবাল দেবতার কাছে। কাবার এক কুয়ার উপর সেটার মূর্তি ছিল। হুবাল দেবতার কাছেই লটারির ব্যাপারগুলো মীমাংসা করা হতো। লটারি আর ভবিষ্যৎকথনের দেবতা ছিলেন হুবাল।

যে লোকটি লটারি পরিচালনা করত তার হাতে সবগুলো তীর দেয়া হলো। এরপর লোকটি সেগুলো শাফল করল। ওদিকে কাবা প্রাঙ্গণে হুবালের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্‌র কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলেন আব্দুল মুত্তালিব, যেন ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ বেঁচে যায়। তাঁর নাম না ওঠে। কিন্তু লটারিতে নাম এলো আব্দুল্লাহর। তখন তিনি ছুরি নিয়ে দেবতা ইসাফ আর নাইলাহ এর কাছে উৎসর্গ করতে নিলেন আবদুল্লাহকে।

ছুরি উঠাতেই বড় ছেলে হারেস এসে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে সরিয়ে দিলেন। সবাই যখন শুনল, তখন এসে আব্দুল মুত্তালিবকে বাধা দিতে লাগল। কেউই চাইত না, আব্দুল্লাহ কুরবান হন। কারণ সবাই ছিল আব্দুল্লাহর প্রতি মুগ্ধ। বোনেরা ভাইয়ের কুরবানির কথা শুনে কেঁদে উঠল। আর কোন কোন ভাই তো বলেই বসলেন, “আব্দুল্লাহর জায়গায় আমাকে কুরবানি করুন। তবু তাঁকে করবেন না!” অনেক বড় বড় সর্দার বললেন, “এভাবে সন্তান কুরবান করা শুরু করলে দেখা যাবে সবার ঘরেই এরকম মানব বলি প্রথা শুরু হয়ে গেছে। বাদ দিন এসব। আমরা টাকা দেব দরকার হলে মানতের ক্ষতিপূরণ হিসেবে।”

সকলে তাঁকে উপদেশ দিল এক জ্বিন-উপাসিকার কাছে যেতে, যদি উনি বলেন কুরবান করতেই হবে তবে সকলে মেনে নিবে। সেই বিখ্যাত জিন উপাসিকার বাড়ি ছিল ইয়াসরিব বা মদিনাতে। কিন্তু ওখানে তাঁকে পাওয়া গেল না। তিনি নাকি গিয়েছেন খায়বারে। তখন তাঁরা খায়বারেই গেলেন। সেখানে গিয়ে আব্দুল মুত্তালিব তাঁকে খুঁজে পেলেন।

ঘটনা খুলে বলবার পর মহিলা বললেন পরদিন আসতে, তাঁর কাছে জ্বিন এসে জানাবে উত্তর। পরদিন, মহিলা উত্তর দিলেন, “তোমাদের মাঝে ক্ষতিপূরণ কত রক্তের বিনিময়ে?”

তাঁরা বললেন, “দশটি উট।”

তখন তিনি বললেন, “ফিরে গিয়ে আবার লটারি কর। যতবার আব্দুল্লাহর নাম উঠতে থাকবে ততবার ১০টি করে উট কুরবান করতে থাকবে।”

আব্দুল মুত্তালিব মক্কায় ফিরলেন।

এরপর লটারির ব্যবস্থা করলেন। লটারি করা হয় আজলান তীরের দ্বারা। অনুষ্ঠিত হয় কাবার ভিতরে।

প্রথম বারেই উঠল আব্দুল্লাহর নাম।

২য় বারেও উঠল আব্দুল্লাহর নাম।

৩য় বারেও।

এভাবে একাদশ বারে গিয়ে দেখা গেল উঠেছে রক্তের ক্ষতিপূরণ।

তাই আব্দুল মুত্তালিব ১০x১০=১০০টি উট কুরবানি দিলেন আর মানতমুক্ত হলেন। নিশ্চিত হবার জন্য আরো তিনবার তিনি তীর ছোঁড়েন এবং তিনবারই ক্ষতিপূরণ ওঠে। তিনি আরো ত্রিশটি উট কুরবানি দিলেন। কুরবানি করা উটগুলো ওখানেই ফেলে আসলেন সবাই, যে কেউ সেই মাংস খেতে পারত। আব্দুল্লাহর বংশে আরও এক পূর্বপুরুষ কুরবানি থেকে রক্ষা পান। তিনি ছিলেন হযরত ইসমাইল (আ)। তাঁর পরিবর্তে কুরবানি হয় একটা দুম্বা।

Comments

comments

About admin

Check Also

তাবলিগের মেহনতে নায়িকা ময়ূরী থেকে খাদিজা ইসলাম

আমরা সবাই কম বেশি পাপী। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন আপনি নিষ্পাপ? পারবেন না। তবে যাদের তওবা নসিব হয় তারা বড়ই সৌভাগ্যবান। আর এই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন হলেন মুনমুন আক্তার লিজা। আপনাদের কাছে যিনি ‘ময়ূরী’ নামে বহুল পরিচিত। বর্তমানে তাবলিগ তথা দ্বীনদার মহলে তিনি ‘খাদিজা ইসলাম’। শফিক জুয়েল ভাইকে বিয়ে করার পর থেকে মাসতুরাত জামাতে ৩ দিন করে সময় লাগাতে লাগাতে ১ চিল্লা বা ৪০ দিন সম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *