Home | মতামত | সাতক্ষীরার ভূমিপুত্র এস এম জগলুল হায়দার

সাতক্ষীরার ভূমিপুত্র এস এম জগলুল হায়দার

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর গ্রামের প্রতিবাদী চরিত্র এস এম জগলুল হায়দার নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করে আজ তিনি প্রান্তজনদের প্রতিনিধি, সাতক্ষীরার ভূমিপুত্র। এস এম জগলুল হায়দার শ্যামনগর উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী কালিগঞ্জ উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের নির্বাচিত সাংসদ।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত সাংসদ তিনি, রোদ-ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়েন তার সংসদীয় আসনের সর্বত্র। কখনো কখনো এমনও ঘটেছে রাত চারটা বাজে-এমন সময় তার বাড়িতে এসে হাজির বেরিবাঁধ এলাকার এক প্রান্তিক মৎসজীবী, জোয়াড়ের পানিতে বাঁধ ভেঙে গেছে, এই মুহূর্তে বাঁধ মেরামত না করতে পারলে পুরো গ্রাম প্লাবিত হয়ে যাবে, প্রান্তিক মানুষেরা আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে; মুষুলধারে বৃষ্টিও হচ্ছে তখন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই একটা টর্চলাইট নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন প্রান্তিক মানুষের আপনজন ‘মেজো ভাই’ জগলুল হায়দার। একজন নির্বাচিত সাংসদ তিনি, তবুও রাতভোর হয়ে সকালের আলোতেও বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাঁধ মেরামত করে বাড়িতে ফিরেছেন তিনি। বাড়িতে এসে একটু বিশ্রাম নিতেই প্রচণ্ড জ্বরের কবলে পড়েছেন, সেই জ্বর মাথায় নিয়ে বের হয়েছেন শ্যামনগরের উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধগুলো দেখতে, তিনি বের হতেই প্রান্তিক মানুষেরা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তাঁর পিছু নেন; এভাবেই একজন মেজো ভাই থেকে সাংসদ জগলুল হায়দার প্রান্তিক মানুষের আপনজনে পরিণত হয়েছেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হুদার নেতৃত্বে গেরিলা ট্রেনিং চলছিল। সেই সময় মাত্র ৯ বছর বয়সে মুক্তিযোদ্ধা পিতার সঙ্গে ট্রেনিংস্থলে গিয়ে হাজির হন জগলুল হায়দার। ক্যাপ্টেন হুদা তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই ছেলে তুমি এখানে কেনো এসেছো?’ ছেলেটি উত্তরে জানায় সে মুক্তিযুদ্ধে যেতে চায়। ক্যাপ্টেন হুদা তার কাছে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি খান সেনা দেখেছো?’ ছেলেটি জানায়, ‘হ্যাঁ দেখেছি।’ ক্যাপ্টেন হুদা আবার প্রশ্ন করেন, ‘বলো তো কেমন দেখতে খান সেনা?’ ছেলেটি উত্তর দেয়, ‘অনেক বড় বড় দেহের মানুষ।’ ক্যাপ্টেন হুদা বলেন, ‘তুমি কি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে পারবে?’ ছেলেটি পুনরায় জবাব দেয়, ‘হ্যাঁ পারবো।’ তখন ক্যাপ্টেন হুদা ছেলেটির পিঠ চাপড়ে কোলে নিয়ে ট্রেনিংরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জানতে চান, ‘এইটুকু ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যেতে চায়, আর তোমরা পারবে না?’ উপস্থিত সবাই সমস্বরে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন।

১৯৬২ সালের ৫ জুন জন্ম নেওয়া এস এম জগলুল হায়দারের শিক্ষা জীবনের শুরু শ্যামনগর সদরের হায়বাদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তার দাদা কাশিমাড়ি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং নানা ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তৎকালীন বৃহত্তর খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও শ্যামনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে তার রক্তে আওয়ামী রাজনীতি এবং মানব সেবার গুণ মিলেমিশে ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাড়ির নিকটস্থ নকিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। নকিপুর হরিচরণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পিতার (অবসর প্রাপ্ত সিভিল সার্জন) কর্মস্থলসূত্রে কালিগঞ্জের মোজাহার মেমোরিয়াল বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত। পরবর্তীতে নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পাশ করে কেশবপুর কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন। কিন্তু পরবর্তীতে আবারও কালীগঞ্জে ফিরে এসে দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সেখান থেকেই এইচএসসি ও স্নাতক পাঠ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

শিশু বয়স থেকে প্ত্যেকের চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা শিক্ষক হওয়ার মত লক্ষ্য থাকলেও জগলুল হায়দার ছিলেন তার ব্যতিক্রম। তিনি ছোটকাল থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একজন আদর্শ রাজনীতিক হিসেবে গড়ে ওঠার। প্রতিবাদী ভূমিকা দিয়ে অসহায় আর দূর্বল ও শোষিত মানুষের সেবা করার। সে কারণে সেই অল্প বয়স থেকেই এলাকায় তার প্রধান পরিচিতি একজন প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে। সাধারণের পাশে বিপদে-আপদে সবসময়ই তার নামটি সবার আগেই উচ্চারিত হত।

এসএসসি পাশের পর উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথমভাগেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আদর্শ মেনে বেড়ে ওঠা জগলুল হায়দারের প্রিয় ব্যক্তিত্ব তার পিতা মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ডাক্তার আবদুল জলিল। খেলাধুলার প্রতি তেমন কোনো মোহ না থাকলেও শিশুকাল থেকেই নাট্যচর্চা করতেন তিনি। তবে তার রাজনৈতিক জীবনের অমূল্য সম্পদ যে তার দ্ব-রাজ গলার বক্তব্য।

২০০১ সাল পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামলে ডজন ডজন মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি পলাতক জীবনযাপন করেন। পরবর্তীতে সেনা শাসিত তথাকথিত তত্ত্ববধায়ক সরকারের দুই বছরও তার জন্য দুর্বিসহ ছিল। তখন তিনি নিজ বাড়িতে থাকতে পারতেন না, তার শুভাকাঙ্খীরা দল বেঁধে তার অবর্তমানে বাড়ি পাহারা দিত।

১৯৯৮ সালে পুলিশ কর্তৃক নকিপুর বাজারের এক ব্যবসায়ী রবীন স্বর্ণকারকে অন্যায়ভাবে আটক করে তার উপর নির্যাতন চালায় পুলিশ। তখনকার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে জগলুল হায়দার ঐ ঘটনার প্রতিবাদ জানান এবং নির্যাতিত ব্যবসায়ী রবীনের পাশে থাকেন তিনি।

প্রায় একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি ১৯৯৯ সালে। তদানীন্তন বিডিআর সদস্যরা অবৈধভাবে নকিপুর বাজারে অভিযান চালায়, সেই সময় তিনি ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে উক্ত অভিযানের বিরোধীতা করেন এবং এক পর্যায়ে বিডিআর সদস্যদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

ঐ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলে তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন।এদিকে তার মুক্তির দাবিতে গোটা শ্যামনগরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তার মুক্তি না মেলার প্রতিবাদে ঐ সময় সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি পানের দোকান পর্যন্ত বন্ধ থাকে দীর্ঘদিন। এক পর্যায়ে প্রশাসন জনতার ভাষা বুঝতে পেরে তার মুক্তির ব্যবস্থা করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জগলুল হায়দার গোটা শ্যামনগর-এর অসহায়, নির্যাতিত ও সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের নেতা হয়ে ওঠেন।

লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক

Comments

comments

About admin

Check Also

মিথ্যা দিয়ে শুরু… মিথ্যা দিয়ে শেষ

কথাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে যে …