Home | মতামত | প্রয়াত সৈয়দ শীলা আশরাফ ও খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা

প্রয়াত সৈয়দ শীলা আশরাফ ও খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা

গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে পথ চলতে কারও গাড়ি-ঘোড়া ভাঙচুর প্রশংসার কাজ নয়। সেটা সমাজে অশান্তির এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

বেগম খালেদা জিয়ার কক্সবাজার যাওয়ার পথে তার গাড়িবহরে হামলা, সাংবাদিক এবং অন্যদের আহত করা যেমন সামাজিক নিরাপত্তার হুমকি, তেমনি বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। সে দলীয় পরিচয় হোক আর নির্দলীয় কাজটি জঘন্য নিন্দনীয়।

এমন জঘন্য ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি। সরকারের কঠোর হাতে এসব কুকর্ম দমনে আন্তরিক অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ এসব করে কেউ কোনো দিন পার পায়নি, এখনো পাবে না। তাই যে কাজে ফল ভালো হবে না, সে কাজ না করাই ভালো।

গত পর্বে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণা করেছিলাম। মানুষ যখন জানতে, শুনতে এবং পড়তে চায় তখন ভারতে অবহেলিত নির্বাসিত দিনগুলো নিয়ে একটা লেখার চেষ্টা করছি। কারণ সেটা আমার জীবনের একটা শ্রেষ্ঠ সময়।

তবে গত সংখ্যায় লেখাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাধুবাদ যেমন পেয়েছি, তেমনি সমর গুহ এমপির নাম বাদ পড়ে যাওয়ায় বড় বেশি অন্তর্জ্বালায় দগ্ধ হয়েছি। আমার তো এমন হওয়ার কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধানগড়ার নাদু, নাজির, হামিদ, শাজাহান মা-বাবাকে ছাতিহাটি থেকে বংশাই নদীর পাড়ে ধানগড়া নিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল।

দিন পনেরো সেখানে তারা ছিল। স্বাধীনতার পর আমার ভাইবোনেরা তাদের যথাযথ সম্মান না করায় গুরুত্ব না দেওয়ায় আমার ভীষণ বিরক্ত লাগত। ১৬ আগস্ট, ১৯৭১ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভারত সীমান্তে বারাঙ্গা পাড়ায় গিয়েছিলাম। সখীপুর থেকে ১৫০-৬০ মাইল হেঁটে যাওয়ার পথে বাবা এবং ছোটভাই বেলাল পেরে উঠছিল না।

বাবাকে কাঁধে নেওয়া যায়নি, ১০-১২ বছরের বেলালকে প্রায় ৪০-৫০ মাইল মনির, হুমায়ুন, সাঈদুর বীরপ্রতীক আরও কে কে কাঁধে বয়েছিল। পরে তাদেরও সে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি বা দিতে পারেনি বলে আমার খারাপ লাগত, সম্পর্কের অবনতি ঘটত। আর চরম দুঃসময়ে যারা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, আমার কর্মীদের দেখাশোনা করেছেন তাদের ভুলি কী করে?

সে রকম একজন সমর গুহ একসময় নেতাজি সুভাষ বোসের সঙ্গে কাজ করেছেন। ফরওয়ার্ড ব্লকের সভাপতি ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের কাঁথি থেকে নির্বাচিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সমর গুহ। আমাদের চরম দুঃসময়ে এক কাপড়ে শিলিগুড়ির হাকিমপাড়া থেকে কলকাতায় গিয়েছিলাম।

সঙ্গে ছিল গৌর, বৈদ্য, লুত্ফর, গোপাল, রাজা দীপঙ্কর অথবা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। সেবার অধ্যাপক শান্তিময় রায়ের বাড়িতে উঠেছিলাম। ভারতে সরকারি লোকজন ছাড়া ওই একবারই আমার বাইরে যাওয়া। তখন সেখানে আমাদের মোনায়েম সরকারও থাকতেন। অভাবনীয় সুন্দর মানুষ। কিছুটা বামঘেঁষা হলেও বঙ্গবন্ধুর জন্য ছিলেন নিবেদিত।

বিশেষ করে ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামে মোনায়েম সরকার আমাদের যারপরনাই আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন। অধ্যাপক শান্তিময় রায়ের বাড়িতে সমর গুহের সঙ্গে প্রথম দেখা। প্রথম দিনেই অনেক কথা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধসংগ্রামীদের ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে সমর গুহ লোকসভায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

তাকে সমর্থন করেছিলেন সুরেন্দ্র মোহন, মধু লিমাই, জর্জ ফার্নান্দেজসহ আরও অনেকে। প্রায় ৪০ জন লোকসভার সদস্য সংসদ মুলতবি রেখে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধসংগ্রামীদের নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছেন। যে কারণে মোরারজি দেশাই আমাদের ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত থাকার পরও কিছু করতে পারেননি। সমর গুহই আমাকে পাটনার কদমকুয়ায় সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন।

অনেকবার সর্বোদয় নেতার বাড়ি যাতায়াত করেছি। একসময় তিনি আমাকে আপনজনের মতো দেখতেন। আমার সঙ্গে জয়প্রকাশ নারায়ণের কাছে নারায়ণগঞ্জের প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমান, রাজা দীপঙ্কর তালুকদার, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, সাভারের মাহাবুব, বাসসের প্রধান জাওয়াদুল করিমসহ আরও অনেকেই গেছেন। জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রথম দিনই আমাদের সাহায্য করার জন্য ১৬টি চিঠি দিয়েছিলেন।

সেখানে জনতা পার্টির সভাপতি চন্দ্রশেখর, মধু লিমাই, জর্জ ফার্নান্দেজ, বিজু পট্টনায়েকসহ আরও অনেকে ছিলেন। ’৭৭-এ মোরারজি দেশাইর হাত থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য সমর গুহের আন্তরিকতা ও ভূমিকা অতুলনীয়। কী করে যে বাদ পড়ে গেলেন বুঝতে পারছি না। যতই ভুল স্বীকার করি, এ ধরনের ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।

খুব দুঃসময়ে নেতাজি সুভাষ বোসের এলভিন রোডের বাড়ির পাশে এক ফ্ল্যাট বাড়ির ১০-১২ তলায় উঠেছিলাম। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির এক সহকর্মী সুবীর ঘোষের বাড়ি। লোকটির তখন দুঃসময় চলছিল। তবুও দাশমুন্সির অনুরোধে আমাদের থাকতে দিয়েছিলেন। মনে হয় তিন বেডরুমের মাঝারি ধরনের বাড়ি।

তখন কলকাতায় কেবলই ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি শুরু হয়েছে। প্রথম তিনিই খাওয়াতেন। আমাদের লটবহর বড় হওয়ায় পরে আমরা তাকে খাওয়াতাম। প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা খরচ হতো। চাল ছিল ২ টাকা সের, মাছ-মাংস ৮-১০ টাকা, চিনি ২-আড়াই টাকা, তেল ৩-৪ টাকা। ৫-৬ টাকার শাক-সবজি, তরিতরকারি কিনলে একজন বয়ে নিতে পারত না। ১৯৬০-’৬২ থেকে ’৬৫ পর্যন্ত আমি বাজার করতাম।

কখনো ৩-৪ টাকার বেশি নয়। বোঝা বয়ে আনতে পারতাম না। বাজারের টাকা বাঁচিয়ে ৪ আনা দিয়ে রিকশায় ফিরতাম। আসলেই সে সময়টা ছিল অন্যরকম। সুবীর ঘোষের বাড়ি থাকতে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়। সে বিয়েতেও গিয়েছিলাম।

বড় কষ্ট লাগে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি সারা ভারতে যুব কংগ্রেসের সব থেকে উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন, যিনি কলকাতায় নাশতা করলে দিল্লিতে দুপুরের খাবার খেতেন, রাতে ঘুমাতেন বোম্বেতে। অমন ব্যস্ত সর্বভারতীয় জনপ্রিয় যুবনেতা আর কখনো হবে না। সেই লোকটি আজ ১৪-১৫ বছর অচেতন বিছানায় পড়ে আছেন। বড় কষ্ট হয়, প্রশ্ন জাগে কেন এমন হলো।

সুব্রত মুখার্জি, সোমেন মিত্র, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, সৌগত রায় এ রকম কিছু নাম তখন একত্রে উচ্চারিত হতো। সুব্রত মুখার্জি ও সোমেন মিত্র সব সময় আমাদের সাহায্য করেছেন। এখনো কখনো দেখা হলে আপনজনের মতো উতলা হয়ে যান। কত মানুষ তখন পাশে দাঁড়িয়েছেন কজনের কথা বলব। কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি শঙ্কর প্রসাদ মিত্র আমাদের এলাকার মানুষ।

’৭২-এ প্রথম কলকাতা গেলে সংবর্ধনার জন্য যে কমিটি করা হয়েছিল তার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন শঙ্কর প্রসাদ মিত্র ও দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে প্রধান অতিথি করে বসু সিনেমা হলে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। আমি তার আগে ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম দেখিনি। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শঙ্কর প্রসাদ মিত্র যখন ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করেন তখন আমার সারা শরীর ঘেমে গিয়েছিল।

সেই শঙ্কর প্রসাদ মিত্র ’৮২ সালে ছিলেন লোকসভার সদস্য। বিশ্বজিৎ নন্দীর ফাঁসির আদেশ রদ করার জন্য তিনজন মানুষ সব থেকে বেশি সক্রিয় ছিলেন। তার মধ্যে প্রধান ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, প্রণব মুখার্জি ও শঙ্কর প্রসাদ মিত্র এমপি। বিশ্বজিৎ নন্দীর ফাঁসির আদেশ রদ হওয়ার আগ পর্যন্ত কলকাতায় শঙ্কর প্রসাদ মিত্র, দিল্লিতে প্রণব মুখার্জি ইন্দিরাজির সঙ্গে একতালে যোগাযোগ করেছিলেন।

আমার মতো একজন দেশছাড়া বাঁধনহারা মানুষ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধসংগ্রামী বিশ্বজিৎ নন্দীর বিষয়ে কতবার ইন্দিরাজির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছি। শেষেরবার তো তিনি কাশ্মীরের রাজভবনে ছিলেন। সেখানেই কথা বলেছিলাম। কোনো অসুবিধা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কখনো সর্বসম্মত প্রস্তাব হয়নি।

এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারেও নয়। কিন্তু বিশ্বজিৎ নন্দীর ফাঁসি রদ করার প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করেছিল। জ্যোতি বসু ও তার স্ত্রী কমলা বসু ভীষণ আন্তরিক ছিলেন। নন্দীর জীবন রক্ষার ব্যাপারে কতবার তাদের রাজভবনে গেছি। আপনজনের মতো যত্ন করেছেন। জ্যোতি বসু ঢাকার বাকরখানি পছন্দ করতেন।

ঢাকার নেতা-কর্মীরা গেলেই বাকরখানি নিয়ে যেত। আমি সেসব রাজভবনে পৌঁছে দিতাম। গেলে কোনোক্রমেই না খেয়ে আসতে দিতেন না। সব সময় এক লটবহর সঙ্গে থাকত। দলীয় কর্মী চার-পাঁচ জন, সরকারি ড্রাইভারসহ আরও তিন-চার জন। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে ও রকম একটা লটবহর নিয়েও খাওয়া-দাওয়ায় এক অভাবনীয় ব্যাপার। মনে হতো যেন নিজের বাড়ি।

তাই বোধহয় নিজেদের মানুষের কাছে কখনোসখনো কিছু বেশি আশা করেছি। হিতৈষীদের মধ্যে সাভারের পরেশ সাহা, যুগান্তর সম্পাদক অমিতাভ চৌধুরীর হূদ্যতা ছিল সবার ওপরে। শিয়ালদার ছক্কু খানসামা লেনে গেলে পরেশ সাহার খাবার ছিল নির্ধারিত। অন্যদের বাইরে খাইয়ে আমাকে পরেশ সাহার বাড়িতে খেতে হতো।

শিলিগুড়ি থেকে এক সকালে শিয়ালদার ছক্কু খানসামা লেনে এসেছিলাম। তখন কিছুই চিনতাম-জানতাম না। অধ্যাপক শওকত ওসমান স্যার তখন সেখানে। অনেক দিন পর স্যারকে দেখে ভীষণ অভিভূত হয়েছিলাম। তিনি সেদিন আমার সঙ্গে খাবার খেয়েছিলেন। তার পকেটে সেদিন কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। বাড়িভাড়া ৪০০, আরও বোধহয় দু-দেড়শ টাকার দরকার ছিল। আমরা কলকাতায় স্যারের জন্য টাকা পাঠাতাম।

মোরারজি দেশাই এসে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ায় দারুণ অসুবিধায় পড়েছিলাম। দুই বা তিন মাসের টাকা পাঠাতে পারিনি। খাওয়া-দাওয়া শেষে দু-তিনটি ইনভেলপ স্যারের হাতে দিলে প্রথম ভেবেছিলেন কোনো জরুরি চিঠি হবে। কিন্তু একটা খুলে টাকা দেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন, ‘কাদের! আমি দুনিয়ার বহু ইতিহাস পড়েছি। এ রকম দুঃসময়ে তুমি আমাদের মাসহারার কথা ভুলোনি?’

বলেছিলাম, এতে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। যাদের দায়িত্ব ছিল আপনাদের সেবা করার তারাই ইনভেলপগুলো আমার হাতে দিয়েছেন আপনাকে পৌঁছে দিতে। স্যার আরও কাঁদছিলেন আরও বলছিলেন, ‘আজ আমার পাঁচ-ছয় শ টাকার খুব দরকার। এ তো দেখছি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।

মন্ত্রী বন্ধু আশরাফের স্ত্রী শীলা ঠাকুর কদিন আগে এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন। আমি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। সৈয়দ আশরাফ এবং তার পরিবারের সঙ্গে আমরা বহুদিনের পরিচিত। আমার বাবা সৈয়দ আশরাফের মাকে মা বলে ডাকতেন। সেই হিসেবে আমরা তাকে দাদি বলে ডাকতাম। সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমাদের দাদু। এটাই চলেছে সারা জীবন।

আশরাফের জন্ম ’৫২ সালের পয়লা জানুয়ারি। ময়মনসিংহ তখন আমাদের কাছে রাজধানীর মতো। কত ছোটাছুটি-ওঠাবসা করেছি। মজার ব্যাপার, আইয়ুব খানের কঠিন নির্যাতনের সময় বাবা একবার নেত্রকোনার সাব জেল থেকে সন্ধ্যার দিকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তখন রাস্তাঘাট, গাড়ি-ঘোড়া তেমন ছিল না। শম্ভুগঞ্জ ফেরি পার হতেই দেড়-দুই ঘণ্টা লাগত।

গভীর রাতে বাবা আশরাফের বাড়িতে এসে কাউকে ডাকাডাকি না করে জেলের কম্বল পেঁচিয়ে বারান্দাতেই পড়ে ছিলেন। আশরাফের মা ফজরের আজানে দরজা খুলে বাইরে বেরোতে গিয়ে পা লেগে আঁতকে ওঠেন, ‘কে গো বাবা! এখানে পড়ে আছেন?’ দেখা গেল আমার বাবা মৌলভী মুহাম্মদ আবদুল আলী সিদ্দিকী।

দিদা সঙ্গে সঙ্গে অনুযোগ করলেন, ‘কী গো তুমি এখানে কেন? একটু ডাক দিলেই তো হতো।’ একেবারে বাধ্য ছেলের মতো, ‘না মা, অত রাতে কাউকে বিব্রত করতে চাইনি।’ এমনই ছিল আশরাফের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধের সময় কতবার যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দিদা বলেছেন, ‘তোমরা সব নিরাপদে কলকাতায় আছো, তোমার ছোট্ট নাতিটাকে কেন হায়েনার মুখে ফেলে রেখেছ? ওকে নিয়ে এসো।’

দাদু বলতেন, ‘নাতি আর এখন ছোট্টটি নেই। তোমার নাতি হানাদারের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায় না বরং নাতির কাদেরিয়া বাহিনীর ভয়ে হানাদার বাহিনী পালিয়ে বেড়ায়।’ দেশ স্বাধীন হলে খুব সম্ভবত ২৮ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ভারতীয় জেনারেলরা হেলিকপ্টারে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা এনেছিলেন। ওর আগে অনেক ঘটনা ঘটেছিল।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে গিয়েছিলাম বঙ্গভবনে। গিয়ে দেখি মোনায়েম খান থেকে শুরু করে এস এম আহসান, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গভর্নর ডা. আবদুল মালেকের যিনি সামরিক সচিব ছিলেন সেই কর্নেল অথবা লে. কর্নেল ফিরোজ সালাউদ্দিন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব।

দাদু নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ হতে দাদু বললেন, ‘তোমার দিদার কাছে যাও। তোমার জন্য পাগল হয়ে আছেন।’ স্বাধীন দেশে প্রথম যখন দিদার সঙ্গে দেখা হয় তিনি মায়ের মতো জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেসব স্মৃতি মনে হলে এখনো নিজেকে সামাল দেওয়া যায় না। লিপি-রূপা ওরা দুই বোন ছোট্ট পরীর মতো। আমাকে পেলে কী যে খুশি হতো।

’৯০-এ দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোয়ার্টারে যেন দেখতে গিয়েছিলাম। আশরাফরা চার ভাই, দুই বোন। সৈয়দ আশরাফ, মঞ্জুরুল ইসলাম, শাফায়েত ইসলাম, শরিফুল ইসলাম। মনে হয় শরিফুলের ডাকনাম ইন্টু। শাফায়েত সেনাবাহিনীতে চাকরি করত। ব্রিগেডিয়ার হয়ে অবসর নিয়েছে।

ভারতে নির্বাসনে ছিলাম ১৬ বছর। সব সময় দেশের জন্য প্রাণ কাঁদত। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। বিশাল ভারতে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ থাকলেও ভারতের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আর আমরা অনেক কিছু জানতামও না। জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক রিফিউজিদের সে যে কী সম্মান আমরা কিছুই জানতাম না।

ভারতীয় পাসপোর্ট পেতে অসুবিধা ছিল না। কিন্তু ভারতীয় পাসপোর্টে বাইরে যাব না। অনেক দেন-দরবারের পর একটা ট্রাভেল ডকুমেন্টের ব্যবস্থা হয়। ইংল্যান্ডের ভিসা চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ভিসা পেলাম। মনে হয় ট্রাভেল ডকুমেন্টে টাইগার সিদ্দিকী লেখা ছিল বলে ইন্টারভিউ দিতে হলো না। তবে দিল্লিতে ব্রিটিশ হাইকমিশনে গিয়েছিলাম, ভিসা অফিসার হায় হ্যালো বলেই ভিসা দিয়ে বিদায় করেছিলেন।

রিফিউজি ট্রাভেল ডকুমেন্ট ছিল বলে হিথরোতেও কোনো জবাবদিহি করতে হয়নি। এমনকি টাইগার সিদ্দিকী নাম দেখে দু-এক জন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলেন। বেরিয়ে আসার সময় দু-তিন জন ইমিগ্রেশন অফিসার একেবারে গেটের কাছে এসে হ্যান্ডশেক করে শুভ কামনা জানিয়েছিলেন। তারাও নাকি মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু যখন হিথরোতে নামেন তখন ইয়াং অফিসার হিসেবে সেখানে ছিলেন। যাই হোক জীবনে প্রথম ইংল্যান্ডে গেছি।

এমনিতে আমরা হাবাগোবা মানুষ। মাননীয় সভানেত্রী ঢাকা থেকে বেগম সাজেদা চৌধুরীকে পাঠিয়েছিলেন। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে নিয়ে গিয়েছিলেন। লন্ডনে যাওয়ার চার-পাঁচ দিন পর এক সংবর্ধনার আয়োজন হয়েছিল। এখন হয়তো আরও লোকজন হয়। কিন্তু তখন অত বড় বাঙালি সমাবেশ আর কখনো হয়নি।

ব্রিটিশ এমপি পিটার শোরসহ ৪০-৫০ জন ইংরেজ এবং আমাদের সব ধরনের নেতৃবৃন্দ ছিলেন। সৈয়দ আশরাফ স্থানীয় সরকারের শিক্ষা বিভাগে কাজ করতেন। লোকসমাগম হয়েছিল দুই-আড়াই হাজার। ইংল্যান্ডে ২০০ লোক নিয়ে খুব একটা কিছু হয় না, হলে সেটাই হয় দারুণ একটা কিছু। এ ক্ষেত্রে দুই-আড়াই হাজার লোক কম কথা নয়।

বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী পরিবারের পক্ষ থেকে বৃহত্তর বিশ্বের জন্য আমাকে উৎসর্গ করে এসেছিলেন। সাজেদা চৌধুরীর বক্তব্য ছিল অসাধারণ। ফজলুর রহমান এমনিতেই বলেন ভালো, সেখানেও বলেছিলেন। সৈয়দ আশরাফ দর্শকের সারিতে বসেছিল। আমার ভালো লাগেনি। তাকে ডেকে মঞ্চে তুলেছিলাম এবং তিনি তার স্বভাবসুলভ খুবই সুন্দর বক্তব্য দিয়েছিলেন।

সেখানে উদ্যোক্তাদের মধ্যে রিয়াজ, সুলতান শরীফ, খান, আতাউর রহমান, জোয়াদার, চঞ্চল, সানিসহ আরও অনেকে ছিল। একটানা তিন মাস ছিলাম লন্ডনে। এর মধ্যে আশরাফের বাড়িতে খাবার খেতে দু-তিন বার গেছি। আশরাফ এমনিতেই খুব মৌজি মানুষ। তার বউর সঙ্গে আমাকে নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলেছিল। তাই আমাকে দেখে আশরাফের স্ত্রী শীলা ভীষণ খুশি হয়েছিল।

আশরাফের মেয়ে তখন চার-পাঁচ বছরের। দু-একটি সিলেটী ভাষায় কথা বলতে পারত। সিলেটীদের মায়া দেয় বলে একটা কথা আছে। সেটা সে বার বার বলত। আশরাফের স্ত্রী মূলত ভারতের উত্তরপ্রদেশের মানুষ। আমার স্ত্রীর বাপ-মার জন্ম ভারতে। উত্তরপ্রদেশের লহ্মেীর তারা বাসিন্দা। ’৫০ সালে আলীগড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে প্রথম কলকাতা, তারপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে টাঙ্গাইল এসে কুমুদিনী কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

আমার স্ত্রীর বাড়ি লক্ষেী এটা শুনে আশরাফের স্ত্রী শীলা ঠাকুর আরও অভিভূত হয়েছিল। ভালোভাবে খাওয়ানোর জন্য কত যে চেষ্টা করেছে লিখে বোঝাতে পারব না। বড় ভালো মানুষ ছিল। বছর দেড়েক আগে একবার মিন্টো রোডে তাকে একটা শাড়ি দিতে গিয়েছিলাম। খুব হাসি-খুশি আন্তরিক ব্যবহার করেছিল।

আমার স্ত্রীকে দেখতে মোহাম্মদপুর আসতে চেয়েছিল। সে আসা আর হলো না। বেঁচে থাকতে আমরা অনেকের অভাববোধ করি না, চলে গেলে বোধ করি। মানুষ মরণশীল, সবাই মরবে। কিন্তু হঠাৎ করে কেউ চলে গেলে বড় বেশি খারাপ লাগে। আল্লাহ তাকে বেহেশতবাসী করুন— এই আমার কামনা।

Comments

comments

About admin

Check Also

মিথ্যা দিয়ে শুরু… মিথ্যা দিয়ে শেষ

কথাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে যে …