Home | মতামত | সৌদি আরবকে বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব দিতে হবে

সৌদি আরবকে বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব দিতে হবে

সৌদি আরব সোফিয়া নামক একটি রোবটকে নাগরিকত্ব দেওয়ার পর তারিক আল মিনা গত ৩১ অক্টোবর বিষয়টি নিয়ে সৌদি গেজেটে একটি কলাম লেখেন। তারিক আল মিনা সৌদি গেজেটের এডিটর এট লার্জ। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তার প্রত্যেকটি কলাম ইমেইল করেন। একমাসের কিছু বেশি হবে তিনি একটি কলাম লিখেছেন, পাকিস্তানের একটি পরিবারকে সৌদি সরকার যে নাগরিকত্ব দিচ্ছে না, তাদের প্রতি অবিচার করছে, এ নিয়ে। যথেষ্ট যুক্তি ছিল তার কলামে। ৩১ অক্টোবরের তারিকের কলামটি মূলত অনেক ক্ষোভে ভরা। কারণ ইতোমধ্যে সৌদি আরব ‘সোফিয়া’ নামের একটি রোবটকে নাগরিকত্ব দিয়েছে। অথচ সেখানে মানুষের নাগরিকত্ব দিচ্ছে না। প্রকৃত মূল্যায়ন হচ্ছে না মানুষের।
তারিকের কলামের মূল বক্তব্যই হলো সৌদিদের মোটা মাথা বলেই তারা মানুষকে নাগরিকত্ব না দিয়ে রোবটকে নাগরিকত্ব দিচ্ছে। আর সৌদিদের মোটা মাথার উদাহরণ দিতে গিয়ে তারিক তার বাসার খুব কাছে তৈরি হচ্ছে এমন একটি ভিলা তৈরির উদাহরণ দিয়েছেন। প্রতিদিন সে বাড়িটির ডিজাইন পরিবর্তন হয়। একবার ওভাল সেফ হয় তো একবার স্কয়ার সেফ হচ্ছে জানালার। এছাড়া প্রায়ই কিছু সৌদি সে ভিলা দেখতে আসেন। আর তারা চলে যাওয়ার পরে দেখা যায়, আবার ভাঙচুর হচ্ছে। আবার নতুন ডিজাইনে তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিনের এই ঘটনা দেখে বিরক্ত তারিক দারোয়ানকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আসলে এটার মূল ডিজাইনে সমস্যা কোথায়? দারোয়ান বাঙালি, তিনি তারিককে বলেন, সৌদিদের অনেক টাকা আছে কিন্তু মাথায় বুদ্ধি খুবই কম; এটাই মূলত সমস্যা।

তারিকের এই কলামটি পড়ার তিনদিন না যেতেই সৌদি আরবে অনেক ওলট-পালট ঘটনা ঘটে গেলো। যার ভেতর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, ক্রাউন প্রিন্স, হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট ৩২ বছরের তরুণ মি. সালমান সৌদি আরবকে বদলাতে চান। সৌদি আরবকে যদি তিনি সত্যিই বদলাতে চান, তাহলে শুধু সৌদি আরবে কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার দিলেই নতুন কোনও সৌদি আরব হবে না। যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রামে নেমেছেন, সে দুর্নীতিও সৌদি আরবের মূল সমস্যা নয়। সৌদির মূল সমস্যা তারিক আল মিনা তার কলামে উল্লেখ করেছেন। সেটা হচ্ছে মেধা ও পরিশ্রম। মূলত সত্তর দশকের মধ্যভাগ থেকে এই পর্যন্ত সৌদি আরবের যে অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, তার বড় অংশ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশিদের শ্রমে ও ঘামে। ২ কোটি ৮৭ লাখ লোক বাস করে সৌদি আরবে। এর ভেতর ৮৭ লাখ বিদেশি। আর ওই ৮৭ লাখের প্রায় ৩৩ লাখ বাংলাদেশি। এখন ৩৩ লাখ আছে। এর আগে আরও অনেক বাংলাদেশি সেখানে তাদের যৌবনের শ্রম দিয়ে এসেছেন। গড়ে এসেছেন সৌদি আরবের অবকাঠামো।

সত্তরের দশক থেকে এখন পর্যন্ত সৌদি যে অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, তা বাস্তবে তাদের সম্পদের তুলনায় বেশি নয়। ২১ লাখ ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এই দেশটি পশ্চিম এশিয়ার সব চেয়ে বড় আরব দেশ। পৃথিবীর এক নম্বর তেল উৎপাদনকারী দেশ। তারপরও কেন এই দেশটি এখনও মূলত এক ধরনের অর্থনৈতিক মন্দায়। সেখানে কেন বেশি শিক্ষিতরা চাকরি পায় না? কেন শপিং মলে বিদেশিদের চাকরি বন্ধ করছে, নিজেদের দেশের লোকের চাকরি দেওয়ার জন্য? নতুন ক্রাউন প্রিন্স হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট শুধু নন, আধুনিকমনস্ক, আধুনিক অর্থনীতি ও সমাজ তিনি জানেন। তাকে অর্থনীতির এই স্বাভাবিক সূত্রটি বুঝতে হবে, অর্থনীতিকে সংকুচিত করে কখনোই অর্থনীতি বাঁচানো যায় না। প্রোটেকশন দিয়ে তো মোটেই নয়। প্রটেকশন দিলে কী হয়, তা তিনি বাংলাদেশে এসে বাংলা সিনেমার অবস্থা দেখে জেনে যেতে পারেন। প্রটেকশনের ফলে এটা বেবিই রয়ে গেলো, হাঁটতে তো দূর থাক, বসতেও শিখলো না। সৌদির অবস্থাও তাই।

সৌদি আরব কোনোমতেই তার দুই কোটি মানুষ নিয়ে আর একের পর এক প্রটেকশন দিয়ে অর্থনীতি বড় করতে পারবে না। যেমন ধরা যাক, সৌদি আরব তাদের শপিং মলে বিদেশি শ্রমিকদের চাকরি করতে দেবে না। এতে তাদের শপিং মল বাড়বে না। অথচ পৃথিবীর সব চেয়ে বেশি লোক ধর্মীয় ট্রাভেলে যায় সৌদি আরবে। তাই তাদের ক্রেতা তো কম নেই। বরং সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় আদৌ আকর্ষণীয় শপিং মল নেই। তাদের গড়ে তুলতে হবে আরও বেশি আকর্ষণীয় শপিং মল। হয়তো সেগুলো করতে তাদের মরুভূমিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সে পরিশ্রম তারা করবে কিভাবে? সে পরিশ্রম বিদেশ থেকে দাস এনে হয় না, কেবল নাগরিক এনে করা যেতে পারে।

তাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরবকে স্বীকৃতি দিতে হবে, যাদের কঠোর পরিশ্রমে সৌদি আরবের আজকের এই অবকাঠামো গড়ে উঠেছে তাদের। এই স্বীকৃতি হতে পারে একমাত্র তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ভেতর দিয়ে। সৌদি আরবে এ মুহূর্তে যে ৩৩ লাখের বেশি বাঙালি আছেন। সৌদি এই পরিবর্তনের অন্যতম একটি কাজ হিসেবে তাদের নাগরিকত্ব দিক, কয়েক মাসের ভেতর তার ফল হাতে হাতে দেখতে পাবে। দেখতে পাবে তখনই এই বাংলাদেশিরা নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলছেন সৌদির মরুভূমিতে নতুন অবকাঠামো। শুধু তাই নয়, এদের যখন দাস থেকে নাগরিকে উন্নীত করা হবে, দেখতে পাবে এক নতুন মানুষ তারা। তাদের কাছ থেকে তখন সৌদি আরব নতুন এক জগতের সন্ধান পাবে। এছাড়া এ স্বীকৃতি তাদের প্রাপ্য। কারণ শ্রমিক হিসেবে তারা অর্থ নিয়েছে, যা তার থেকে সৌদিকে গড়ে দিয়েছে অনেক বেশি। তাই রোবট সোফিয়ার থেকে বাংলাদেশিরা আগেই সেখানে নাগরিকত্ব পাওয়ার দাবি রাখে কয়েক কোটি গুণ।

সৌদি ক্রাউন প্রিন্স তার কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় আমেরিকায় কাটিয়েছেন। তার ভেতর অন্তত এই চিন্তা আসা উচিত, মেধা প্রবেশের সুযোগ না দিলে কোনও দেশ শুধু সম্পদ নিয়ে এগুতে পারে না। সৌদির হাইড্রো কার্বনের দাম হয়তো এখন কমে গেছে। আর যদি নাও বাড়ে, তাতেও কোনও ক্ষতি নেই। সৌদিকে যেতে হবে বিভিন্ন রকমের উৎপাদনে। যা এতদিনে অনেক বেশি হওয়া উচিত ছিল। সেই উৎপাদনে যেতে হলে সমাজকে কিভাবে গড়তে হয় ক্রাউন প্রিন্স নিশ্চয়ই আমেরিকায় সেটা দেখেছেন। তিনি খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, বাংলাদেশ থেকে তার দেশ আগাম চুক্তি করে নিচ্ছে বেশিরভাগ অদক্ষ শ্রমিক (অদক্ষ হলেও তার দেশের শ্রমিকের থেকে অনেক দক্ষ)। অন্যদিকে শত বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশ থেকে মেধা চলে যাচ্ছে আমেরিকায়। সেখানে তারা কঠোর পরিশ্রম করে আমেরিকাকে গড়তে সাহায্য করছে।

আমেরিকায় বাংলাদেশিরা যেভাবে ধীরে ধীরে নাগরিকত্ব পাওয়ার সহজ সুযোগ পায়, এই সুযোগ এখন ক্রাউন প্রিন্সকে বাংলাদেশিদের দিতে হবে। তিনি যদি এ সুযোগ দেন তাহলে এ মুহূর্তে আমেরিকার থেকে তিনিই বেশি বাংলাদেশ থেকে মেধা পাবেন। কারণ, ট্রাম্পের আমেরিকা ধর্মীয় বিদ্বেষসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশিদের বাধা দিচ্ছে। সৌদি সহজে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে। সৌদি আরবে হাইড্রোকার্বনের দাম পড়ে গেছে ঠিকই কিন্তু সেখানে সৌরশক্তি আছে। এই সৌরশক্তিকে নানাভাবে কাজে লাগানোর জন্য এখন আধুনিক সৌদি আরব গড়ার সময়। এ সময়ে আমেরিকার মতোই নিজেকে উম্মুক্ত করতে হবে সৌদিকে।

সৌদি যদি বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব দেয়, যদি দীর্ঘস্থায়ীভাবে সেখানে থাকার জন্য আমেরিকার গ্রিন কার্ডের মতো বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা করে, বাংলাদেশের মেধা ও শ্রম নিঃসন্দেহে বদলে দেবে সৌদি আরবকে। ২১ লাখ ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারই তখন প্রয়োজনীয় ভূমি হয়ে উঠবে তাদের। অকেজো বা দুঃসহ মরুভূমি আর থাকবে না। আর এই পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হলে সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে আর কোনও দ্বিধা করার কোনও কারণ নেই। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে বাকি অন্যান্য দেশের ৫৪ লাখের কী হবে? তাদেরও নাগরিকত্ব দিতে হবে। সৌদি যদি নিজেকে পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে তাকে বুঝতে হবে, তেল বা ভূখণ্ড মূল সম্পদ নয়, মূল সম্পদ মানুষ। মানুষ যে মূল সম্পদ, তার প্রমাণ দিচ্ছে চীন ও ভারত উন্নতি করে। সৌদিকে তাই এখন মূল সম্পদের দিকে তাকাতে হবে।

লেখক স্বদেশ রায়

Comments

comments

About admin

Check Also

মিথ্যা দিয়ে শুরু… মিথ্যা দিয়ে শেষ

কথাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে যে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *