Home | বিশেষ প্রতিবেদন | যৌনকর্মী বানাতে নারীদের প্রবাসে পাঠানোর মানে হয় না

যৌনকর্মী বানাতে নারীদের প্রবাসে পাঠানোর মানে হয় না

বুঝে-শুনে নারীদের যৌনপেশায় বিদেশে পাঠানোর কোনো মানে নেই বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট সালমা আলী। এজন্য বায়রাকে দায়ী করেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট এ আইনজীবী। ‘বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি’র সাবেক প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালনকারী সালমা আলী প্রবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায় নিয়েও কাজ করছেন। প্রবাসী নারী শ্রমিক এবং তাদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি জাগো নিউজ’র মুখোমুখি হন তিনি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সায়েম সাবু। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারে আজ থাকছে শেষ পর্ব-
জাগো নিউজ : মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক নারী শ্রমিক ফিরে আসছেন। তাদের কেমন দেখছেন?

সালমা আলী : যারা নির্যাতন সইতে না পেরে ফিরে আসছেন তাদের অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। সব বিক্রি করে বিদেশে গেছেন। ফিরছেন নিঃস্ব হয়ে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন। ধার-দেনা করে ফিরছেন অনেকেই।
অনেক নারীকে কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে সেখানে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। হোটেলে, বাসাবাড়িতে নিয়ে যৌনপেশায় বাধ্য করানো হচ্ছে। আমি একবার নেপালে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে একটি মেয়েকে আটকালাম। বলল, নেপাল যাব আগে। সেখানে একজন আসবে, তার সঙ্গে দুবাই যাব। অথচ সে গ্রামের একজন মেয়ে। সাদা পাসপোর্ট তার। কিছুই জানে না। কিন্তু যারা জানে, তারা কিছুই করছে না। নেপাল হয়ে অনেক মেয়েই চলে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ : নারী শ্রমিক পাঠানোর আগে তো বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়?
সালমা আলী : প্রশিক্ষণে যা শেখানোর কথা, তা না শিখিয়ে অন্য কিছু শেখায়। কীভাবে সাজতে হয়, মেকাপ করতে হয়, তাই শেখানো হয় প্রশিক্ষণে। অথচ ইংরেজি বা মৌখিক আরবিটুকুও শেখানো হয় না।
আপনি দুবাই গেলে দেখবেন, বাঙালি নারীরা বিমানবন্দরে গিয়ে বসে আছেন। কোনো অচেনা লোক এসে তাকে নিয়ে যাবেন, তার জন্যই বসে থাকা। এভাবে কোনো মানুষ বিদেশে পাঠানো যায়!

জাগো নিউজ : এজন্য প্রধানত কাকে দায়ী করা যায়?
সালমা আলী : আমি মনে করি, প্রথমত এজেন্ট (বায়রা) এজন্য দায়ী। কারণ তারা লাভজনক ব্যবসা মনে করে নারী শ্রমিকদের সর্বনাশ করছে। তারা উদ্দেশ্যভাবেই এটি করছে।
জাগো নিউজ : সরকারের মনিটরিং থাকার কথা?

সালমা আলী : সরকারের অনেক কিছুই করার কথা। কিন্তু আমরা ন্যূনতম তদারকিও দেখি না। নারী শ্রমিকদের বাইরে যেতে টাকা লাগার কথা নয়। অথচ লাখ টাকা খরচ করে যাচ্ছে। দালালরা নিয়ে যাচ্ছে। কে এজেন্ট, কে দালাল তা সরকারও বলতে পারে না।
দুই সপ্তাহ আগে এক মেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে আটকা পড়ে। সে ট্রাভেল এজেন্সির নামটি মনে রাখতে পেরেছিল। আমার কাছে খবর আসে। আমি ওই ট্রাভেল এজেন্সির মালিককে ফোন দিয়ে বললাম, এক সপ্তাহের মধ্যে ওই মেয়েকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে না আনলে আইনগত ব্যবস্থা নেব। সে আমার নাম শুনেই বলল, ম্যাডাম দেখছি। পাঁচদিনের মধ্যেই ফিরিয়ে এনেছে। এগুলো তো প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। সরকার দেখবে সব। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেই।

জাগো নিউজ : সমাধান কী?
সালমা আলী : সাজসজ্জার প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনো লাভ নেই। ভাষা শেখানো জরুরি। যদি পাঠাতে হয়, দক্ষ করে পাঠাক।
জাগো নিউজ : নারী শ্রমিকদের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি সরকার তো ইতিবাচকভাবেই দেখছে…
সালমা আলী : বিবিসিতে আমার বক্তব্য প্রকাশের পর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, সব নারী শ্রমিকই তো সমস্যায় নেই। অনেকেই ভালো আছেন। আমি তো বলিনি, সব শ্রমিকই খারাপ অবস্থায় আছেন। অনেকেই ভালো আছেন, তা সবাই জানে। এতে উচ্ছ্বাসিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ অনেকেই কষ্টে আছেন। তার জন্যই সব উচ্ছ্বাস ম্লান হয়ে যাওয়ার কথা।আমি মনে করি, নারীদের প্রবাসে গৃহশ্রমে পাঠানো যাবে না। কেউ যদি বলে তারা ভালো আছেন, তাহলে মনে করতে হবে, কিছু একটা লুকানো হচ্ছে। একজন তৃণমূলের নারী হয়তো স্বামী পরিত্যক্তা। মুসলিম দেশে গেছেন। তার ভালোমন্দও বোঝেন না। তার কাছ থেকে ভালো-খারাপ আপনি মূল্যায়ন করতে পারবেন না। আপনাকে মানদণ্ড দিয়ে বিচার করতে হবে। সুলতান সুলেমানের দাসীদের মতো সবই সহ্য করতে হচ্ছে তাদের।
যারা ফিরে আসেন, তাদের শরীর দেখেন। অনেকের গায়ে কামড়ের দাগও আছে। হিংস্র প্রাণীর মতো আঘাত করা হয়েছে তাদের শরীরে।
জাগো নিউজ : বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর ভূমিকা নিয়ে কী বলবেন?

সালমা আলী : তাদের তো কানে তুলা দেয়া। লুবনা নামে এক কূটনীতিক আট-দশ বছর ধরে জর্ডানের দূতাবাসে আছেন। কেন? তার বদলি হচ্ছে না কেন? নারীদের প্রবাসে গৃহশ্রমে পাঠানোর সিন্ডিকেটে সবাই অংশীদার। টাকার ভাগ সবাই পান। এ কারণেই ব্যবস্থা নেই।
যৌনকর্মী বানাতে নারীদের প্রবাসে পাঠানোর মানে হয় না। যেকোনো পেশায়, যেকোনো মানুষ যেতেই পারেন। কিন্তু বুঝে-শুনে। এখানে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবারের দায় আছে।

জাগো নিউজ : মামলা হলো অনেক। মামলাগুলোর পরিণতি কী?
সালমা আলী : মামলা নিয়ে আরেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ভুক্তভোগীরা কোনো খরচ দিতে পারে না মামলা পরিচালনার জন্য। দেবেই বা কোত্থেকে? তার আছেই বা কি? ঠিকানা থাকে না। মোবাইল নম্বর দিলে তা বন্ধ থাকে।
অনেক কষ্টের পর দু-একটি মামলায় ভুক্তভোগী সহায়তা করলে আমরা লড়তে পারি। হয়তো আমরা মাধ্যমকে ধরছি। কিন্তু মূল সিন্ডিকেট অপরাধী অধরাই থেকে যাচ্ছে।
জাগো নিউজ : আপনার পরামর্শ কী?

সালমা আলী : সবার আগে নারীকে সম্মান দিতে হবে। ভারত কেন পাঠাচ্ছে না? তাদের দেশেও নারীরা অভাবে আছে। ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা কেন নারী গৃহশ্রমিক পাঠানো বন্ধ করল, তা জানতে হবে। নেপাল কেন পাঠাচ্ছে না, তা ভাবতে হবে।
নারীকে ওসব দেশের পুরুষরা মানুষ হিসেবে দেখছে না। তারা ভাবে নারী অন্য কাজ করবে, বিছানাতেও যাবে, সে যেই হোক। লেবানন ও জর্ডানের অবস্থা খুবই খারাপ। নইলে জর্ডানের একটি হাসপাতালে কী করে মাত্র দুই বছরে ৪৫ নারীর অস্বাভাবিক মৃতদেহের খোঁজ মেলে!
নারী নির্যাতনের ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটছে। কিন্তু স্বপ্ন দেখানোর নাম করে নারীর এমন সর্বনাশ কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। নারীকে মানুষ ভাবলেই এ নির্যাতন বন্ধ হবে।
এএসএস/এসআর/এমএআর/বিএ

Comments

comments

About admin

Check Also

বিভাগীয় শহর সফর করবেন খালেদা

বিভাগীয় শহরগুলোতে সফরের পরিকল্পনা করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সিলেট বিভাগের মাধ্যমে তার এই সফর শুরু হওয়ার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া বগুড়া জেলাসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জেলায়ও সফরে যেতে পারেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তার এই সফরগুলোতে মানবিক বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসা হলেও মূল লক্ষ্য হবে নির্বাচনী প্রচারণা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০ নভেম্বর বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *