Home | বিশেষ প্রতিবেদন | যে ভূমি অফিসার দুর্নীতিকে জাদুঘরে পাঠিয়েছেন!

যে ভূমি অফিসার দুর্নীতিকে জাদুঘরে পাঠিয়েছেন!

যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভূমি অফিসে ঢুকতেই চোখে পড়বে লাল রঙের ব্যানারে লেখা,‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’। এখানেই শেষ নয়, ব্যানারের নিচে ঘুষ ও দুর্নীতির খবর জানাতে দেয়া আছে হটলাইন নম্বর ও ওয়েব অ্যাড্রেস।

আপাতদৃষ্টে মনে হতেই পারে, উপজেলা পর্যায়ে এমন ব্যনার তো দেয়াই যায়!তাহলে ইউনিয়ন পর্যায়ের তহশিল অফিসগুলোর অবস্থা কি?
অভয়নগর উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়েও দেখা মিললো একই ব্যানারের। সাথে সেই হটলাইন নম্বর ও ওয়েব অ্যাড্রেস। উপজেলার বাকি তহশিলগুলোতেও দৃশ্যমান স্থানে ঝুলছে একই ব্যানার। শুধু একটি হটলাইন নম্বর বদলে দিয়েছে ভূমিসেবার চিত্র। দুর্নীতি রুখতে নেয়া অনেক পদক্ষেপের একটি হল হটলাইন।

অভয়নগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মনদীপ ঘরাই চলতি বছরের মার্চে যোগদান করার পর থেকেই বদলাতে থাকে ভূমি ব্যবস্থাপনার দৃশ্যপট। কাজ শুরুর দিনই অফিসকে দালালমুক্ত ঘোষণা দেন। মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য আবেদনকারীকে নিজে ভূমি অফিসে এসে এসি ল্যান্ডের কাছে আবেদন জমা দিতে হবে মর্মে নিয়ম চালু করা হয়।

তবে এসি ল্যান্ড সরকারি কাজে বাইরে থাকলেও সমস্যা নেই। আছে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ব্যবস্থা। সেবাপ্রত্যাশীরা এসি ল্যান্ডের মুখ থেকেই শুনে যাচ্ছেন, নামজারি কেসের সরকারি খরচ ১১৫০ টাকা।

এর পরের পদক্ষেপটা ছিল পুরো অফিসকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা। রেকর্ডরুম সহ সব জায়গা চলে এসেছে ডিজিটাল চোখের নিয়ন্ত্রণে; এমনকি এসি ল্যান্ডের রুমও। রেকর্ডরুমের নথি খোঁজা নিয়ে ছিল দীর্ঘসূত্রতা।তিন-চার দিন লেগে যেত বা লাগানো হতো। এখন বছর ও কেস নম্বর অনুযায়ী প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়া হয়েছে নথি। তৈরি হয়েছে রেকর্ড রুম ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার। নথি খুঁজে পেতে এখন লাগে ৩-৪ সেকেন্ড। নেই মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলার উপায়।

ছোট বিষয়ে বড় ভোগান্তির আরেক নাম ছিল কোর্ট ফি কেনা। ২০ টাকার কোর্ট ফি কিনতেও ছিল হয়রানি। দালালদের দৌরাত্ম্যে তার দাম কখনও কখনও ৪০ টাকায় গিয়েও দাঁড়াত। সে সমস্যা যে ভূমি অফিসার দুর্নীতিকে জাদুঘরে পাঠিয়েছেন!
নিরসনে ও সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে সততার অভ্যাস গড়ে তুলতে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের প্রথম ‘সততা পয়েন্ট’।
এখানে এসে কোনো নজরদারি ছাড়াই নির্দিষ্ট বাক্সে রাখা কোর্ট ফি নিয়ে পাশের বাক্সে টাকা রেখে যাচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীরা। এ পর্যন্ত সহস্রাধিক কোর্ট ফি বিক্রি হয়েছে। এসি ল্যান্ডের সাথে সেবাপ্রত্যাশীরা যাতে নির্ভয়ে ও সহজেই দেখা করতে পারেন, সেজন্য এসি ল্যান্ড মনদীপ ঘরাই খুলে ফেলেছেন রুমের পর্দা। সরিয়ে ফেলেছেন রুমের কার্পেট।

লেখার একদম শুরুতে যে হটলাইন নাম্বারের কথা বলা হয়েছে তা বাংলাদেশের প্রথম ভূমি হটলাইন নাম্বার। কারণ, ০১৮৩৪৯০০০৫৫ শুধু একটি ফোন নম্বর নয়, এর সাথে একটি ডট কম জুড়ে দিলে অর্থাৎ, 01834900055.com এ লগইন করে অনলাইনেই জানানো যাবে অভিযোগ, মিলবে সেবা।

উপজেলায় পরিষদ, থানা, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, পৌরসভাসহ সব তহশিল অফিসে দৃশ্যমান জায়গায় টানানো হয়েছে হটলাইন নম্বরের ব্যানার। এখন ভূমিসেবা নিতে সরকারি খরচের বাইরে এক পয়সাও লাগছে না অভয়নগরে। সেই সাথে মানুষ পাচ্ছে ভোগান্তিবিহীন সেবা।

এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সম্পাদক সুনীল দাস বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধে কমিটির অংশ হিসেবে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলতে পারি, অভয়নগর উপজেলার ভূমি অফিস সাধারণ জনগণকে ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়াই সেবা দিচ্ছে। বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে।’…এ বিষয়ে এসি ল্যান্ড মনদীপ ঘরাই বলেন, ‘দুর্নীতির শূন্য আর ১০০ এর মধ্যে কোনো সূচক নেই বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে যে ভূমি অফিসার দুর্নীতিকে জাদুঘরে পাঠিয়েছেন!
মনে করি। হয় দুর্নীতি আছে, না হয় নেই। আমরা দ্বিতীয় দলে। তবে সত্যিকার অর্থে দুর্নীতিমুক্ত অফিস গড়ার পথটা মোটেও সহজ নয়। ঘন্টার পর ঘণ্টা কর্মচারিদের বোঝানো, হটলাইনের মাধ্যমে ঘুষের টাকা ফেরত দেয়া, লজ্জা দেয়া, শাস্তির ভয় দেখানো, দালালের কাছ থেকে মুচলেকা নেয়া—সবই আছে এ পথচলার তালিকায়। তবে, এখন জনগণকে মন মিশিয়ে সেবা দিতে পারছি। স্টাফরাও ইতিবাচকভাবে সহযোগিতা করছে। আর, ধারাবাহিকতায় রক্ষার দায় কিছুটা সেবাগ্রহীতাদেরও আছে।’
পৌর এলাকার সেবাগ্রহীতা আবদুস সামাদ বলেন,‘শ্বশুরবাড়ির জমির একটা বিষয় নিয়ে তথ্য জানতে এসেছিলাম। সরাসরি এসি ল্যান্ড স্যারের কাছ থেকে সমাধান পেয়েছি। অযথা টাকা খরচের কোনো প্রশ্নই নেই”

উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির বলেন, ‘মনদীপ স্যার আমাদের মধ্যে সততার অভ্যাস গড়ে দিয়েছেন। আমরা শতভাগ স্বচ্ছভাবে সবাইকে সেবা দিচ্ছি।’

ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত অফিস গড়ার পাশাপাশি অফিসকে জনবান্ধব করতে গড়ে তোলা হয়েছে ভূমি অফিসে দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক থিমপার্ক স্বাধীনতা অঙ্গন, দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মুক্ত আকাশ পাঠাগার ‘মু্ক্তপাতা’, নামাজের স্থান, সেবাগৃহ, নারীবান্ধব কক্ষ সহ অজস্র ছোট-বড় উদ্ভাবন ও উদ্যোগ।

Comments

comments

About admin

Check Also

ক্যু-পাল্টা ক্যু’র ৭ নভেম্বর

৭ নভেম্বর, ১৯৭৫। বাংলাদেশ সময়ের এক অস্থির অধ্যায়। যে অধ্যায় কারও কাছে অন্ধকার, কারও কাছে আলোর। এ সময় ক্যু আর পাল্টা ক্যু’র অমানিশায় কয়েক মুহূর্তের ‘সরকারহীন’ রাষ্ট্রও দেখতে পায় বিশ্ব। রক্তপাতহীন আর রক্তপাতের এ দিনের ক্যু বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের রাজনীতির জন্ম দেয়। সিপাহী-জনতার মাঝে ওই সময় যে দ্বিধা গেড়ে বসে, তাতে রাজনীতির পটপরিবর্তনও হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর এক পাল