Home | বিশেষ প্রতিবেদন | গোয়েন্দা কাহিনী ৫৯: খুনি ছিল উৎসুক মানুষের ভিড়ে

গোয়েন্দা কাহিনী ৫৯: খুনি ছিল উৎসুক মানুষের ভিড়ে

১৬ জানুয়ারি, ২০১৬। শীতের সকালটা শুরু হয়েছিল অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মতো।

কর্মচাঞ্চল্য সর্বত্র। শুধু নারায়ণগঞ্জ শহরে ভিন্নরূপ। আতঙ্ক চারদিকে। সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই শীতলক্ষ্যা পাড়ের এই জনপদের বাসিন্দারা ভয়ঙ্কর এক ঘটনার মুখোমুখি। শহরের দুই নম্বর বাবুরাইল এলাকার ‘আশেক আলী ভিলা’ নামের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে দুই শিশু এবং নারীসহ একই পরিবারের পাঁচজনের লাশ পাওয়া গেছে। তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। খুনি কে বা কারা-এমন প্রশ্ন ঘুরপাক তখন পুলিশের মনে। একই প্রশ্ন জনমনেও। খবর ছড়িয়ে পড়ায় সেই বাড়ির চারপাশ ঘিরে মানুষের ঢল। অনেকে আবার আতঙ্কে ঘর থেকেই বের হননি। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে—এ নিয়েই মানুষের কানা ঘুষা।

পুলিশ, র‌্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য তখন ওই বাড়িতে। পাঁচটি রক্তাক্ত লাশ। কারও চেহারা থেঁতলানো। কারও গলায় আঘাতের চিহ্ন। মাত্র দুকক্ষের ছোট্ট ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সঙ্গে কার এমন শত্রুতা, এভাবে তাদের নৃশংসভাবে খুন করা হলো। গোয়েন্দাদের মাথাতেই ঢুকছে না। খুনের শিকার পাঁচ জনের মধ্যে দুটি শিশু রয়েছে। রয়েছে দুই নারীও। খুন করে দুর্বৃত্ত বাইরে থেকে তালা মেরে পালিয়ে যায়। গোয়েন্দাদের ধারণা, এটি পরিকল্পিত গ্যাং কিলিং। খুনিরা সংখ্যায় বেশ কয়েকজন ছিল বলেই ধরে নিয়েছে গোয়েন্দারা। খবর শুনে ছুটে আসে নিহতদের স্বজনরা। কারও স্বামী, মা, বাবা, ভাই, বোন ভাগ্নে-সবাই এসেছে খবর শুনে। তাদের আহাজারিতে সেখানকার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে গোয়েন্দারাও কাজ শুরু করেছে। দুই রুমের ফ্ল্যাটের আনাচে কানাচে খুঁজে দেখছে, খুনিদের ফেলে যাওয়া কিছুর সন্ধান পাওয়া যায় কি না। কিন্তু কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ি ঘিরে হাজারও মানুষ। সেই ভিড়ের মধ্যেও পুলিশ কিছু খোঁজ করছে। গোয়েন্দারা আত্মীয়স্বজনদের জেরা করে কিছু জানার চেষ্টা করে। নিহতদের স্বামী, ভাই, ভাগ্নেদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

এ ঘটনায় খুনির সন্ধান পেতে গোয়েন্দাদের বেশি সময় লাগেনি। উত্সুক মানুষের ভিড়ের মধ্যেই ছিল সেই খুনি। সেও অন্যদের মতো দেখতে এসেছিল লাশ। প্রকৃত অর্থে পুলিশের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করাটাই ছিল তার উদ্দেশ্য। আর ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, খুনি ছিল একজনই। একজন খুন করেছে পাঁচজনকে। একে একে। আর এই খুনি হলো পরিবারেরই সদস্য। ভাগ্নে। মামির সঙ্গে পরকীয়ার ফল স্বরূপ গোটা একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যকে জীবন দিতে হয়েছে। খুনের রহস্য বেরিয়ে আসার পর হতবাক পুলিশ, হতবাক মানুষ। বিচারিক আদালত সেই ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

সে এখন কারাগারে বন্দী। তবে উচ্চ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে একাই হত্যা করেছে ভাগ্নে মাহফুজ। ঠাণ্ডা মাথায় একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ২০ বছর বয়সী এ অপেশাদার ঘাতক। কীভাবে সে একের এক মোট পাঁচজনকে হত্যা করেছে তার বর্ণনা দিয়েছে পুলিশ ও আদালতে। ঘাতক মাহফুজ মামলার বাদী শফিকুল ইসলামের বড় বোন আছিয়া বেগমের ছেলে। আছিয়া বেগম শহরের পাইকপাড়া এলাকায় স্বামী শরফুল মিয়া ও অপর ২ সন্তান নিয়ে বসবাস করেন।

যেভাবে হত্যাযজ্ঞ : বাসাটি দুই রুমের। মাহফুজের ছোট মামা শরিফুল ও তার স্ত্রী লামিয়া থাকেন প্রথম কক্ষে। বড় মামি তাসলিমা তার সন্তান সুমাইয়া ও শান্ত থাকেন দ্বিতীয় কক্ষে। বড় মামা শফিকুল সপ্তাহে এক দিন বাসায় আসেন। তিনি বাসায় না থাকলে তার শ্যালক অর্থাৎ তাসলিমার ভাই মোশারফ ওরফে মোর্শেদ বোন, ভাগ্নিকে নিয়ে ভিতরের কক্ষে থাকেন। বাসার পাশেই মোর্শেদেও হোসিয়ারি কারখানা রয়েছে। শফিকুল যেদিন বাসায় থাকেন মোর্শেদ সেদিন তার কারখানায় ঘুমায়। ছোট মামা শরিফ আহমেদ তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ চলে যায়। ছুটি না পাওয়ায় বড় মামা শফিকও রাতে ঢাকার কর্মস্থল থেকে বাসায় আসতে পারেননি। এ খবর নিশ্চিত হয়ে সন্ধ্যার কিছু সময় আগে মাহফুজ একা শফিকের বাসায় যায়। ১৫ জানুয়ারি শুক্রবার সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে মাহফুজ বড় মামা শফিকুলের বাসার দরজায় নক করে।

এ সময় ভিতরের কক্ষে তাসলিমা, লামিয়া, সুমাইয়া টিভি দেখছিল। দরজা নক করার শব্দে প্রথম কক্ষে থাকা শান্ত দরজা খুলে দেয়। সামনের কক্ষে প্রবেশ করে শান্তকে মাহফুজ বলে ভাইয়া কাউকে বল না আমি এসেছি। এ সময় সে শান্তকে ১০ টাকা দিয়ে খাটের নিচে অবস্থান নেয়। এই কক্ষে শরিফুল ও লামিয়া বসবাস করে। শিশু শান্তও কাউকে কিছু বলে না। রাত ১০টায় বাসায় আসেন তসলিমার ভাই মোর্শেদ। সেও বাসায় প্রবেশ করে টিভি দেখতে শুরু করে। রাত সাড়ে ১০টায় সিগারেট পান করতে মোর্শেদ বাড়ির বাইরে যান। একটি স্টার সিগারেট বাসার বাইরে পান করেন এবং ১টি সিগারেট নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসায় প্রবেশ করে সিগারেটটি লামিয়ার খাটের ওপর রেখে দেন।

ভিতরের কক্ষে কোনো খাট নেই ফ্লোরে বিছানা পেতে তারা থাকেন। ভিতরের রুমে টিভি দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে লামিয়া ফ্লোরে ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় তাসলিমা লামিয়াকে না ডেকে লামিয়ার খাটে মোর্শেদকে ঘুমানোর কথা বলে প্রথম রুমে গিয়ে বিছানা ঠিকঠাক কমর দেন। এরপর তাসলিমার ভাই মোর্শেদ প্রথম কক্ষের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েন। তিনি শুয়ে শুয়ে তার মোবাইল সেট দিয়ে ইন্টারনেটে হিন্দি সিনেমা দেখতে শুরু করেন। রাত সাড়ে ১২টায় মোর্শেদ বিছানা থেকে উঠে লাইট নিভিয়ে দেন। রাত আড়াইটায় মাহফুজের প্রস াবের বেগ পায়। এ সময় সে মনে কমর মোর্শেদ এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। মাহফুজ খাটের নিচ থেকে বের হতে চেষ্টা করার সময় তার মাথা খাটের উপরে লেগে শব্দ হয়। মোর্শেদ শব্দের আওয়াজ শুনে সে খাটের নিচে লাইট মেরে মাহফুজকে দেখতে পায়। মোর্শেদ তাত্ক্ষণিকভাবে ভিতরের কক্ষে থাকা তার বোন তাসলিমাকে ডেকে এনে মাহফুজের অবস্থান খাটের নিচে বলে জানান। তাসলিমা মাহফুজকে খাটের নিচ থেকে বের করে আনেন। এ সময় কেন এখানে এসেছে মাহফুজ তা জানতে চান তাসলিমা ও মোর্শেদ। এক পর্যায়ে তাসলিমা বলে ঠিক আছে এখন অনেক রাত হয়েছে মোর্শেদ। তোর সঙ্গে মাহফুজকে শুইয়ে রাখ। এ কথা বলে দুই কক্ষের মাঝখানের দরজা বন্ধ করে দিয়ে তাসলিমা ভিতরের কক্ষে শুয়ে পড়েন। রাত পৌনে ৩টার দিকে মাহফুজের মনে হয় মোর্শেদ ঘুমিয়ে পড়েছে। এ সময় মাহফুজ রান্না ঘমর গিয়ে পুতা নিয়ে আসে।

তা দিয়ে মোর্শেদের মাথায় আঘাত করে। বার বার। মোর্শেদের মুখ থেকে শুধু গোঙ্গানির শব্দ বের হচ্ছিল। এবার মাহফুজ কক্ষের এক পাশ থেকে একটি শার্ট এনে মুমূর্ষু মোর্শেদের গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা নিশ্চিত করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহফুজ নিজেকে সামলে নিয়ে নিহত মোর্শেদের লাশটিকে কাঁথা দিয়ে ঢেকে ফেলে। এরপর সে অনুমান করার চেষ্টা করে বিষয়টি কেউ টের পেয়েছে কিনা। সে আবারও রান্না ঘরে যায়। সেখান থেকে সোয়াবিন তেল নিয়ে আসে প্রথমে নিজের মাথায় দেয় এবং পরে মোর্শেদের লাশের ওপর কিছু তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনও ধরে যায়। পরক্ষণেই সেভাবে আগুন ধরে গেলে সে নিজেই পুড়ে মরবে। সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেই আগুন নিভিয়ে দেয়। হত্যার পর মাহফুজ কক্ষের মধ্যে পায়চারি করে। মাহফুজ শোকেস থেকে মাথায় দেওয়ার তেল নিয়ে নিজের মাথায় দেয়। এরই মধ্যে ফজরের আজান দিয়ে দেয়। শান্ত ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে প্রস াব করে আবার গিয়ে শুয়ে পড়ে।

ভোর সাড়ে ৬টায় ঘড়ির অ্যালার্ম বাজতে থাকে। অ্যালার্মের শব্দে তাসলিমা জেগে ওঠেন। ছেলে শান্তকে স্কুলে পাঠাতে ডেকে তোলেন। শান্তকে তাসলিমা নাস্তা খাইয়ে গেট খুলে স্কুলে পাঠিয়ে দেয়। এরপর তাসলিমা দ্বিতীয় কক্ষে গিয়ে আবার শুয়ে পড়েন। মাহফুজ বুঝতে পারে বড় মামি তাসলিমা শুয়ে পড়েছেন। এরপরই মাহফুজ ভিতরের কক্ষে প্রবেশ করে তাসলিমাকে ডেকে তোলে বলে, মোর্শেদ তাকে ডাকছে। মোর্শেদ ভিতরের কক্ষে প্রবেশের সময়ই মাথায় সেই পুতা দিয়ে আঘাত করে। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এরপর একটি কাপড়ের টুকরা দিয়ে তাসলিমার গলায় ফাঁস দিয়ে তাকে হত্যা করে। এ সময় ঘাতক মাহফুজ রক্তমাখা পুতা নিয়ে ভিতরের কক্ষে প্রবেশ কমর দেখে লামিয়া ফ্লোরে এপাশ ওপাশ করছে। লামিয়া চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে হাতের পুতাটি লামিয়ার মাথায় ছুড়ে মারে। লামিয়ার মাথা ফেটে রক্ত ঝরা অবস্থাই সে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় মাহফুজ পুতাটি ফ্লোরে রেখে দড়ি খুঁজতে থাকে। এরই ফাঁকে লামিয়া পুতাটি নিয়ে মাহফুজকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারলে পুতাটি গিয়ে ঘুমন্ত শিশু সুমাইয়ার মাথায় পড়ে। তখন সে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। মাহফুজ পুতাটি নিজের দখলে নিয়ে পুনরায় লামিয়াকে মাথায় আঘাত করলে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মাহফুজ এবার লামিয়ার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করে।

এদিকে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত সুমাইয়ার রক্তক্ষরণে অনেকটা দুর্বল হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। এবার মাহফুজ একটি প্যান্ট নিয়ে সুমাইয়ার গলায় ফাঁস দিয়ে তাকে হত্যা করে। চারজনকে হত্যার পর মাহফুজ এ বাসায়ই অবস্থান করতে থাকে। সকালে স্কুল শেষ করে তাসলিমার ছেলে শান্ত বাসায় এসে দরজা নক করে। এ সময় মাহফুজ প্রথম কক্ষে পড়ে থাকা তাসলিমার লাশটি টেনে হিঁচড়ে ভিতরের কক্ষে নিয়ে যায় এবং কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলে।

এদিকে দরজার বাইরে শান্ত মা মা বলে দরজা খোলার জন্য ডাকতে থাকে। এক পর্যায়ে মাহফুজ দরজা খুলে শান্তকে ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ কমর দেয়। শান্ত ভিতরের কক্ষে প্রবেশ করে। তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। হত্যার পর পুতা দিয়ে শান্তর মুখে বেশ কয়েকটি আঘাত করে তার মুখমণ্ডল থেঁতলে দেয়। পর পর ৫টি হত্যাকাণ্ড শেষে মাহফুজ বাথরুমে গিয়ে রক্তমাখা পুতা, হাত, মুখ ও নিজের রক্তমাখা প্যান্ট ধুয়ে ফেলে। বাসায় থাকা অন্য একটি প্যান্ট পরে বাসা থেকে বের হয়। বাসার দরজায় তালা বন্ধ করে চাবিটি বাড়ির নিচের পানির সেফটি টজ্ঝাংকে ফেলে দেয়। বাসা থেকে বেরিয়ে মাহফুজ পাশে মোর্শেদের কারখানায় চলে যায়।

সেখানে গিয়ে মাহফুজ গোসল করে। গোসল করে মাহফুজ কারখানায়ই ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবেই মাহফুজ ঘটায় এ ৫টি হত্যাকাণ্ড। পুলিশ জানতে পারে, নৃশংস ৫ খুনের ঘটনা নিহতদের আত্মীয় মাহফুজ একাই ঘটিয়েছে। এ ঘটনার পেছনে অন্য আর কেউ নেই। ছোট মামি নিহত লামিয়ার সঙ্গে পরকীয়া ছিল তার। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়। ঘটনার ১৫ দিন আগে এ নিয়ে মাহফুজকে জুতা পেটা করে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

Comments

comments

About admin

Check Also

ক্যু-পাল্টা ক্যু’র ৭ নভেম্বর

৭ নভেম্বর, ১৯৭৫। বাংলাদেশ সময়ের এক অস্থির অধ্যায়। যে অধ্যায় কারও কাছে অন্ধকার, কারও কাছে আলোর। এ সময় ক্যু আর পাল্টা ক্যু’র অমানিশায় কয়েক মুহূর্তের ‘সরকারহীন’ রাষ্ট্রও দেখতে পায় বিশ্ব। রক্তপাতহীন আর রক্তপাতের এ দিনের ক্যু বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের রাজনীতির জন্ম দেয়। সিপাহী-জনতার মাঝে ওই সময় যে দ্বিধা গেড়ে বসে, তাতে রাজনীতির পটপরিবর্তনও হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর এক পাল