Home | বিশেষ প্রতিবেদন | গোয়েন্দা কাহিনী: ৬০ আশপাশেই খুনি

গোয়েন্দা কাহিনী: ৬০ আশপাশেই খুনি

কদিন আগে দেশে ফিরেছেন মোক্তার মণ্ডল। বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছেন।তার মোবাইলে একটি কল আসে। ‘হ্যালো। কে বলছেন! আমি মোক্তার। জি ভাই। এই তো কয়েক দিন আগে ফিরছি বাহরাইন থেকে। কে, আমার ছেলে! হ্যাঁ, রিফাত স্কুলে গেছে। এই তো চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। কিন্তু ভাই, আপনে কে বলছেন? পরিচয় তো শুনলাম না। ’ এভাবে কথা বলে যাচ্ছেন মোক্তার মণ্ডল। হঠাৎ চিত্কার করে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘ভাই কী বলতাছেন। আমার ছেলে আপনাদের কাছে, মানে? কী বলেন! ১৫ লাখ টাকা! ভাই ভাই!’ ফোনের লাইন কেটে যায়। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রিফাতের এমন অপহরণের খবর পেয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মাসহ পরিবারের লোকজন।

বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিয়েও রিফাতের খোঁজ পায় না। পুলিশও তন্নতন্ন করে রাজবাড়ীর আনাচে-কানাচে চষে বেড়াচ্ছে। সুখবর আসে না কোথা থেকেও। এটি রাজবাড়ীর ঘটনা। মিজানপুর ইউনিয়নের চরনারায়ণপুর গ্রামের মোক্তার মণ্ডলের ছেলে রিফাত হোসেন অপহূত হয় ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর। সকালে স্কুলে যায় রিফাত। একে একে দিন যেতে থাকে। রিফাতের সন্ধান কেউ পায় না। পুলিশ রাজবাড়ীর সীমানা পেরিয়ে পাশের জেলাগুলোতেও তল্লাশি চালাতে থাকে। আবারও মুক্তিপণের টাকা চেয়ে মোক্তার মণ্ডলের কাছে ফোন আসে। কিন্তু কোথায় কীভাবে টাকা দেওয়া হবে, এ বিষয় নিয়ে অপহরণকারীরা কথা বলে না। মোক্তার মণ্ডলের আত্মীয়-স্বজন যে যেখানে ছিল চলে এসেছে রিফাতের খবর শুনে। কেউ যাচ্ছে পীর-ফকিরের কাছে, কেউ যাচ্ছে মাজারে। শিন্নি-সাদকা সবই করছে। কিন্তু খবর পাচ্ছে না তারা রিফাতের। রিফাত অপহরণের এই ঘটনাটি ধীরে ধীরে আলোচিত হয়ে উঠতে থাকে। সহপাঠীরা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করে। মিছিল-মিটিং চলতে থাকে।

পুলিশের ওপর চাপ আসে ওপর মহল থেকে। পুলিশও ছুটছে এদিক-সেদিক। মোক্তার মণ্ডলের আপন ছোট ভাইকে পুলিশ আটক করে সন্দেহভাজন হিসেবে। পুলিশ ব্যাপক জেরা করে। কোনো তথ্য না পাওয়ায় তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পুলিশের কাছে খবর আসে, স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী রনির সাইকেলের পেছনে রিফাতকে দেখা গেছে। যেদিন নিখোঁজ হয় রিফাত, সেদিনই তাকে দেখা যায়। গোয়েন্দারা খোঁজ নেয়। তারা জানতে পারে, রনি নেই এলাকায়। শুধু রনি নয়, নেই রঞ্জন আর রাসেলও। এরা প্রত্যেকেই মাদক ব্যবসায়ী। পুলিশের সন্দেহ বাড়ে এদের ওপর। গোয়েন্দারা তাদের সোর্সগুলোকে কাজে লাগাতে থাকে। মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং শুরু করে। পুলিশ রঞ্জনের বাসায় যায়।

রঞ্জনকে না পেয়ে তার এক আত্মীয়কে ধরে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে পাঁচ দিন পেরিয়ে যায়। পুলিশ জানতে পারে, রঞ্জন একজন মুসলিম মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে। তার অবস্থান ফরিদপুরের ভাঙ্গায় তার এক খালার বাসায়। অভিযান চালানোর আগে সেখানকার কিছু সোর্সকে নজরদারিতে রাখতে বলে পুলিশ। সোর্সরা সেই বাসায় গিয়ে রঞ্জনের খোঁজ করে। টের পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালায় রঞ্জন। পরে পুলিশ সেখানে গেলেও আর পায় না তাদের। এদিকে পালানোর সময় মাদারীপুরের বেশমপুর এলাকায় স্থানীয় কিছু ছেলেদের হাতে রঞ্জন ধরা পড়ে তার প্রেমিকা সোহেলীসহ। তাদের মধ্যে মিলন নামে এক সন্ত্রাসীও ছিল। সে সোহেলীর কাছ থেকে তার চাচার নম্বর নেয়। চাচাকে ফোন দিয়ে সোহেলীর কথা জানায়। তাকে পেতে হলে ২০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে হবে বলে মিলন হুমকি দেয়। সোহেলীর চাচা দ্রুত সেই রাজবাড়ী পুলিশের কাছে খবর দেয়। সোহেলীর চাচাও ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছিল রঞ্জন রিফাত অপহরণের আসামি।

পুলিশ মিলনকে ফোন করে জানায় রঞ্জনকে আটকে রাখতে। নইলে তাকে আসামি করা হবে বলে হুমকি দেয় পুলিশ। পুলিশ অভিযান চালায় মাদারীপুরে। সেখানে গিয়ে পাকড়াও করে রঞ্জনকে। এরপর তাকে জেরা করা হয়। পুলিশ জানতে চায়, রিফাত কোথায়? রঞ্জনের জবাব, ‘রিফাত সেপটিক ট্যাংকিতে’। পুলিশ কর্মকর্তারা হতাশ। জীবিত পাওয়া গেল না শিশু রিফাতকে। ধরা পড়ে রনি ও রাসেলও। অপহরণের সাত দিনের মাথায় শিশু রিফাতের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয় সেপটিক ট্যাংকি থেকে। রঞ্জন জানায়, অপহরণের দুই ঘণ্টার মধ্যেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় রিফাতকে। তাকে রাখার কোনো জায়গা না থাকায় হত্যা করে বলে জানায় রঞ্জন। রাসেল জানায়, রঞ্জন জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তারা একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। এক সময় রঞ্জন তাদের বুদ্ধি দেয়, প্রবাসী মোক্তারের ছেলে রিফাতকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করলে ১৫ লাখ টাকা পাওয়া যাবে। ভালোভাবে চলা যাবে। তারা রিফাতের বাসার আশপাশেই থাকে। রনির যাতায়াত রয়েছে সেই বাসায়।

যে কারণে খুব সহজেই রিফাতকে নিয়ে আসা যাবে। এই রনি সাইকেলের লোভ দেখিয়ে রিফাতকে নিয়ে যায়। তবে রাসেল ধরা পড়েনি। রঞ্জন পুলিশকে জানায়, অপহরণের পর শিশুটিকে নেশা জাতীয় ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর ওই দিন রাতেই তাকে ঘরের মধ্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে প্রতিবেশী ভৈরব শীলের ল্যাট্রিনের হাউসের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। এদিকে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রিফাত হোসেনকে হত্যায় জড়িত থাকার দায়ে দুজনকে ফাঁসি ও একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ওসমান হায়দার এ রায় দেন। ফাঁসির দণ্ড পাওয়া দুজন আসামি হলেন রক্তিম ওরফে রঞ্জন (২৬) ও রাসেল (২৬)। যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া আসামি রনি (২৬)। বাহরাইন প্রবাসী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের চরনারায়ণপুর গ্রামের মোক্তার মণ্ডলের ছেলে রিফাতকে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এক সপ্তাহ পর রঞ্জনের বাড়ির শৌচাগার থেকে রিফাতের লাশ উদ্ধার করা হয়।

Comments

comments

About admin

Check Also

ক্যু-পাল্টা ক্যু’র ৭ নভেম্বর

৭ নভেম্বর, ১৯৭৫। বাংলাদেশ সময়ের এক অস্থির অধ্যায়। যে অধ্যায় কারও কাছে অন্ধকার, কারও কাছে আলোর। এ সময় ক্যু আর পাল্টা ক্যু’র অমানিশায় কয়েক মুহূর্তের ‘সরকারহীন’ রাষ্ট্রও দেখতে পায় বিশ্ব। রক্তপাতহীন আর রক্তপাতের এ দিনের ক্যু বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের রাজনীতির জন্ম দেয়। সিপাহী-জনতার মাঝে ওই সময় যে দ্বিধা গেড়ে বসে, তাতে রাজনীতির পটপরিবর্তনও হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর এক পাল